একটা সময় ছিল যখন কোডের সামান্য একটা ‘সেমিকোলন (;)’ মিস হওয়ার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকাতে হতো। স্ট্যাক ওভারফ্লো (Stack Overflow) ঘেঁটে, দশটা ফোরাম পড়ে তারপর হয়তো একটা সমাধান মিলতো। কিন্তু গত এক-দেড় বছরে দৃশ্যপট একদম পাল্টে গেছে। আমাদের জীবনে জাদুর কাঠির মতো এন্ট্রি নিয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই (AI)।
আজকাল এআই শুধু আর সায়েন্স ফিকশন মুভির বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের মতো সাধারণ ডেভেলপারদের প্রতিদিনের সঙ্গী। চলুন আড্ডাচ্ছলে জেনে নিই, এআই কীভাবে আমাদের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট জার্নিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ, দ্রুত আর আনন্দদায়ক করে তুলেছে।
১. বয়লারপ্লেট কোড (Boilerplate Code) লেখার বিরক্তি শেষ
নতুন একটা প্রজেক্ট শুরু করতে গেলেই রাউটিং সেটআপ করা, ডাটাবেস কানেকশন লেখা বা বেসিক অথেনটিকেশনের কোড লেখা এই কাজগুলো বারবার করতে কারই বা ভালো লাগে?
এখন Cursor বা Claud-এর মতো টুলস চলে আসায় এই একঘেয়েমি কাজগুলো আর করতে হয় না। আপনি শুধু কমেন্ট বক্সে লিখবেন আপনার কী চাই, আর চোখের পলকে ম্যাজিকের মতো পুরো স্ট্রাকচার বা ফাংশন আপনার স্ক্রিনে হাজির! আপনার ফোকাস এখন শুধু লজিক আর ক্রিয়েটিভিটিতে, টাইপিংয়ে নয়।
২. বাগ ফিক্সিং (Bug Fixing) এখন আর দুঃস্বপ্ন নয়
কোড করবেন আর বাগ (Bug) আসবে না, এটা তো অসম্ভব! কিন্তু আগে একটা লজিক্যাল এরর বা সিনট্যাক্স এরর খুঁজতে গিয়ে যে পরিমাণ কফি আর চোখের ঘুম নষ্ট হতো, এআই সেটা অনেক কমিয়ে দিয়েছে।
এখন টার্মিনালে কোনো লাল কালির এরর মেসেজ দেখলে সেটা কপি করে সোজা এআই-কে জিজ্ঞেস করলেই হয়। সে শুধু আপনাকে ভুলটা ধরিয়েই দেয় না, বরং কেন ভুল হয়েছে এবং সঠিক কোডটা কী হবে সেটাও চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দেয়। মনে হয় যেন পাশে একজন সিনিয়র ডেভেলপার বসে আপনাকে গাইড করছে!
৩. জগাখিচুড়ি কোডকে ক্লিন (Clean) ও অপটিমাইজ করা
অনেক সময় ডেডলাইনের চাপে আমরা তাড়াহুড়ো করে এমন কোড লিখে ফেলি, যা হয়তো কাজ করে, কিন্তু দেখতে একদম জগাখিচুড়ির মতো লাগে। ৬ মাস পর নিজের কোড দেখেই মনে হয়, “এইটা কে লিখছে ভাই!”
এআই এখানে দারুণ কাজ করে। আপনার লেখা এলোমেলো কোডটা এআই-কে দিয়ে যদি বলেন, “Please refactor and optimize this code”, সে মুহূর্তের মধ্যে কোডটাকে ক্লিন, রিডেবল (Readable) এবং পারফরম্যান্সের দিক থেকে অপটিমাইজ করে দেবে।
৪. নতুন টেকনোলজি শেখা এখন হাতের মুঠোয়
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং মানেই প্রতিদিন নতুন কিছু শেখা। আগে নতুন কোনো ল্যাঙ্গুয়েজ বা ফ্রেমওয়ার্ক শিখতে গেলে মোটা মোটা ডকুমেন্টেশন পড়ে মাথা হ্যাং হয়ে যেত।
এখন ধরুন, আপনি জাভাস্ক্রিপ্ট (JavaScript) খুব ভালো পারেন কিন্তু পাইথন (Python) শিখতে চাচ্ছেন। আপনি এআই-কে বলতে পারেন, “আমি জাভাস্ক্রিপ্ট জানি, আমাকে জাভাস্ক্রিপ্টের কনসেপ্ট ব্যবহার করে পাইথন বুঝিয়ে দাও।” ব্যাস! এআই আপনার মতো করে, একদম আপনার লেভেলে নেমে এসে জিনিসগুলো বুঝিয়ে দেবে।
৫. টেস্টিংয়ের (Testing) বোরিং কাজটা এআইয়ের ঘাড়ে
সত্যি করে বলুন তো, ইউনিট টেস্ট (Unit Test) লিখতে কয়জনের ভালো লাগে? বেশিরভাগ ডেভেলপারই এই কাজটা এড়িয়ে যেতে চান।
কিন্তু ভালো সফটওয়্যার বানাতে হলে টেস্টিং জরুরি। মজার ব্যাপার হলো, এখন আপনি আপনার ফাংশনটা এআই-কে দিয়ে বললেই সে বিভিন্ন এজ কেস (Edge cases) চিন্তা করে পারফেক্ট একটা টেস্টিং স্ক্রিপ্ট লিখে দেয়। আপনার কাজ শুধু সেটা রান করে দেখা!
এআই কি আমাদের চাকরি খাবে?
এআইয়ের এতসব ম্যাজিক দেখে অনেকের মনেই একটা ভয় কাজ করে “এআই কি তবে ডেভেলপারদের চাকরি খেয়ে নেবে?”
খুব সহজ ভাষায় বলি না, এআই আপনার চাকরি খাবে না। এআই নিজে থেকে কোনো প্রজেক্টের আর্কিটেকচার বানাতে বা ক্লায়েন্টের পেঁচানো বিজনেস লজিক বুঝতে পারে না। এআই হলো একটা টুল, আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
তবে হ্যাঁ, “এআই ডেভেলপারদের রিপ্লেস করবে না, বরং এআই-তে দক্ষ একজন ডেভেলপারই অন্যদের জায়গা দখল করবে।”
তাই এআই-কে ভয় না পেয়ে একে নিজের পেয়ার প্রোগ্রামার (Pair Programmer) বানিয়ে নিন। দেখবেন, আপনার কোডিং জার্নি কতটা রিল্যাক্সিং আর প্রোডাক্টিভ হয়ে উঠেছে।
হ্যাপি কোডিং!